তাকে আমি হারিয়েছি, নাকি সে আমায়
হারাবে- এমনই বুঝি ছিল অভিপ্রায়!
জিত হলো সীমান্তের, তারই আশেপাশে
ছড়িয়েছি শান্তিফুল, মৃত মোহঘাসে।
তাকে আমি হারিয়েছি তেপান্তর পার
হয়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি আমার
সন্ধ্যালাগা শব্দ হয়ে, গন্ধ হয়ে আসে
বাষ্প হয়ে মিশে থাকে পড়ন্ত আকাশে।
০৪-০৯-২০১৩
হৃদয় অপেক্ষা করে থাকে
কখন তার গোপন
দেরাজ থেকে পাওয়া
প্রিয়তম চিঠির মতো
তুমি
ছড়িয়ে পড়বে আমার কোলে
আর আমি
অহেতুক সমস্ত
চৈত্র-বৈশাখ-আষাঢ়
পেরিয়ে চলার অর্থ খুঁজে পাব
তোমার বুকের মেঠো গন্ধে
তোমার কৃষ্ণ চোখের তারায়।
১৯-০২-২০১৩
মনে আছে একদিন এত লোডশেডিং
অন্ধকারে কুপি জ্বলছে দূরে
মোমবাতির আলোয় আমরা
কি সুখী দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম
অস্থায়ী ছোট একটা বইয়ের দোকানে
আর তুমি ফস করে কিনে দিয়েছিলে
খড়কুটো। তোমার ঝোলাব্যাগে থাকতো
টাটকা আষাঢ়ে মেঘ আর ঝরে পড়া
দু-এক আঁজলা ছাতিমফুল কি রুদ্রপলাশ
যেসব নিমগ্ন রাস্তা দিয়ে এসে
তুমি দাঁড়িয়ে থাকতে ঠিক আমার
বাসে তুলে দিতে আর সকালের গল্প বলতে
ফেরার সেই সব জনাকীর্ণ রাস্তায়
আজ আর কোনো গাছ নেই।
১১-০৮-২০১২
বর্ষা আসে না তবে গ্রীষ্মের দাপট কমে আসে। ক্লান্ত পাতার গায়ে কোথা থেকে একটু হলুদ লাগে, একটু আপনভোলা হয়ে থাকে গাছ। পাখি আর পোকাদের আনাগোনা বাড়ে। এই সব ব্যস্ত ডাকাডাকি আর ওড়াউড়ি কমে আসে বিকেলের দিকে। ওরা কাকে এমন মনপ্রাণ দিয়ে চিনেছিল তার দাবী কোথাও থাকে না। কেউ কেউ হয়তো ডাকে একটানা। কখনো ডাকটা শোনায় দীর্ঘ কোনো প্রশ্নের মতো। কেবল এক অনন্ত অভ্যাসের ঝোঁকে তৈরী হয়ে চলা। মেঘের ছবির মতো প্রত্যাশাহীন। সমস্ত দিনের মধ্যে, সমস্ত রাতের মধ্যে আকাশের গান হয়ে মিশে থাকে।
লুকিয়ে গেছি দেয়ালঘড়িটাকেও
সময়ঝাঁকায় ইচ্ছে নিলাম চুরি
পুরোনো ছাদ বন্ধ বলো কাকে
ঈশাণ খোপে নামছে বটের ঝুরি
সেবার ভীষণ ঝড়ের মাথায় এসেই
আছড়ে কবাট ক্ষেপিয়ে দিলে ভয়
এবার এলে পুবের হাওয়ার দেশে
দুঃখ চেপে আগের মতন নয়
হে প্রত্যাশী এমন আষাঢ়খাতায়
রেলের শোলোক ঝমঝমিয়ে এসো
দেখতে কেমন মেঘের জাজিম পাতা
যাচ্ছে ধুয়ে তোমার প্রেমের শেষ-ও
কিছু সম্পর্ক নিঃস্ব করে
রেখে যায়। কোথায় যায় কে জানে।
চলে গেলে এইভাবে
বসে থাকি। তারা দেখি সারা রাত।
বসে বসে এরকম ভাবতে চেষ্টা করি
কিজানি এই বুঝি ভালো
শেষমেষ এরকমই তো হয়। তারপর
সত্যি বলতে
ভালোটা বিশ্বাস হয়না কিছুতেই।
শেষটাও নয়।
তাই হয়ত সেরকম কাজ হয়না
বসে থাকি সারা রাত। তারা দেখি।
আজ সকাল সকাল ইমনকে মনে পড়লো। সন্ধ্যার পবিত্রতম কিছু রঙ বুকে নিয়ে যে অস্তরাগরঞ্জিতা অপেক্ষা করে থাকে সূর্য ডুবে যাওয়ার, চন্দনগন্ধি সেই কিশোরীর নাম ইমন। ওর জন্য একটি তার পঞ্চমে, আরেকটি নিষাদে রেখে বাঁধা হয় তানপুরো। জোয়ারী করে তোলা হয় সাঁঝের গাঙ, যার ওপর সে অনায়াসে ভাসাতে পারে তার পালকের মতো ফুরফুরে, মুক্তোর মতো নিটোল আসমানী ময়ূরপঙ্খী।
সন্ধ্যা নেমে আসে। পুব-আকাশে মেঘ সরে যায়, হঠাত করে একফালি চাঁদ দেখতে পেয়ে খুশী হয় কিশোরী। দুচোখে তার কড়ি মধ্যমের বিস্ময় ফুটে ওঠে। ময়ূরপঙ্খীর খোলা ছাদে জাফরি কাটা আলসের ওপর ঝুঁকে পড়ে সে। আর কতো দেরী? কখন আসবে তার প্রীতম? আকাশে তারা ফুটতে শুরু করেছে যে! তবে কি আজ দেরী হবে? হাওয়ায় উড়তে থাকে তার রেশমের মতো সুরেলা আঁচল। জ্যোতস্নায় ধুয়ে যায় তার গা। মনে মনে একান্তভাবে গান্ধারকে ডাকে সে। এসো গহীন, এসো।
অরণ্যের মধ্যে, স্ফটিকের আসনে বসে মালায় প্রহর গাঁথে হেমবরণ, পলাশলোচন শুদ্ধ গান্ধার। অনন্ত প্রেমরসে বিভোর হয়ে থাকে মধ্যরাতের মতো গহীন সেই পুরুষ। গন্ধর্বলোকে তার কাছে পৌঁছয় ইমনের ডাক।
একসময় কিশোরীর বন্ধ চোখের ওপর ভাসতে থাকে শুদ্ধ গান্ধারের ছায়া। ইমনের কাঁপতে থাকা অধরে সে বীণকারের অমোঘ আঙুল রাখে।
ইমনসকাশে গান্ধারকে যেমন করে দেখতে পাওয়া যায়, এমন আর কোথাও পাওয়া যায় না। এই তীব্র সকালে কেন মনে পড়লো আজ তাদের কথা? আমার রৌদ্রস্নাত, তরতরে ঝরঝরে সকালগুলোও কি আসলে নিবিড় কোনো সন্ধ্যার জন্যই অপেক্ষা করে থাকে?
হয়তো তাই। এক মায়া-অন্ধকারে মিশে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে আমাদের অবচেতন। অজান্তে সাধনা করে সেই সময়ের জন্য, যখন কিশোরী ইমনকে বিস্তৃতি দেবে নিষাদ ছুঁয়ে রেখাবের সুর লাগানো গান্ধার আর গান্ধারকে পরম যত্নে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নেবে কমলকলির মতো ফুটে উঠতে থাকা ইমন।